অস্ট্রেলিয়া প্রবাদ আছে, “রত্ন চিনতে জহুরির প্রয়োজন হয়।” বাংলাদেশের ফুটবলে এই প্রবাদটি যেন বারবার নেতিবাচকভাবেই প্রমাণিত হচ্ছে। ঠিক এক বছর আগের কথা—কম্বোডিয়ায় লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়িয়ে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্ব খেলেছিলেন এক প্রবাসী কিশোর। নাম আরহাম ইসলাম (Arham Islam)। তার চোখে ছিল বাংলাদেশের হয়ে বড় মঞ্চে খেলার স্বপ্ন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বা কোচের অদূরদর্শিতায় তাকে বলা হয়েছিল, “এখনই সময় হয়নি, অপেক্ষা করো।”
সেই অপেক্ষার ফল মিলল, তবে বাংলাদেশের জার্সিতে নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়ার (Socceroos) জার্সিতে। অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-২০ দলের চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন আরহাম। জাপানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া হাই-ভোল্টেজ ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য তাকে দলে ভিড়িয়েছে অজিরা। বাংলাদেশের যে ছেলেটিকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের জন্যও যোগ্য মনে করা হয়নি, আজ তিনি স্পেন ও জাপানের মতো পরাশক্তির বিপক্ষে লড়বেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে।
এই আর্টিকেলে আমরা আরহামের এই অবিশ্বাস্য উত্থান, বাংলাদেশের ফুটবলের আক্ষেপ, এবং তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-২০ দল ও জাপান সফর:
ডিসেম্বর মাসেই জাপানে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-২০ দল। এই টুর্নামেন্টটি তরুণ ফুটবলারদের জন্য নিজেদের প্রমাণ করার এক বিশাল মঞ্চ।
- প্রতিপক্ষ: স্বাগতিক জাপান এবং ইউরোপিয়ান জায়ান্ট স্পেন। জাপান অনূর্ধ্ব-২০ দলের পাশাপাশি স্থানীয় একটি শীর্ষ ক্লাবের বিপক্ষেও ম্যাচ খেলবে অস্ট্রেলিয়া।
- নতুনদের সুযোগ: সম্প্রতি ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্ট খেলা অভিজ্ঞ দলটির অনেককেই এই সফরে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। নতুন করে ১৩ জন তরুণ তুর্কিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যারা অভিষেকের অপেক্ষায় আছেন। আরহাম ইসলাম তাদেরই একজন।
- ক্লাব প্রোফাইল: আরহাম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ স্তরের ক্লাব ওয়েস্টার্ন ইউনাইটেড (Western United) একাডেমির অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়ে খেলছেন। সেখানে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাকে জাতীয় দলের নির্বাচকদের নজরে এনেছে।
খেলোয়াড় প্রোফাইল: কে এই আরহাম ইসলাম?
আরহাম ইসলাম একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ফুটবলার। আধুনিক ফুটবলে এমন খেলোয়াড়দের কদর সবচেয়ে বেশি।
- পজিশন: তিনি মূলত রাইট উইং (Right Wing) হিসেবে খেলেন। তার গতি এবং ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম।
- ভার্সেটালিটি: দলের প্রয়োজনে তিনি রাইট ব্যাক (Right Back) হিসেবেও খেলতে পারেন। অর্থাৎ, আক্রমণে যেমন ধারালো, রক্ষণেও তেমনই বিশ্বস্ত।
- বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক: গত বছর নভেম্বরে কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছিলেন তিনি। সেটিই ছিল কোনো বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রথম প্রবাসী ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি।
বাংলাদেশের ‘না’ এবং কোচের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
আরহামের গল্পটা হতে পারত বাংলাদেশের ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু সেটি এখন আক্ষেপে রূপ নিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের জন্য দল গঠন করছিলেন বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ও তৎকালীন কোচ সাইফুল বারী টিটু।
কেন বাদ পড়েছিলেন আরহাম? শোনা যায়, আরহাম জাতীয় দলের হয়ে ট্রায়াল দিতে চেয়েছিলেন এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু কোচ সাইফুল বারী টিটু তাকে সরাসরি জানিয়ে দেন, “তোমাকে আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে, এখনই সময় হয়নি।”
কোচ তখন নির্ভর করেছিলেন জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড আল আমিন, শেখ মোরছালিন এবং আরেক প্রবাসী ফাহামিদুল ইসলামের ওপর। ফলাফল? ভিয়েতনামে বাংলাদেশ দল আশানুরূপ কিছুই করতে পারেনি। অথচ যাকে ‘সময় হয়নি’ বলে বাদ দেওয়া হলো, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বকাপ খেলা দেশের বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ পেলেন।
আধুনিক একাডেমি বনাম ক্যাম্প কালচার:
আরহামের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কেবল তার ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার সুশৃঙ্খল ফুটবল কাঠামোর বড় অবদান রয়েছে। তিনি খেলছেন ওয়েস্টার্ন ইউনাইটেড (Western United) এর মতো এ-লিগের শীর্ষ ক্লাবের একাডেমিতে। সেখানে একজন খেলোয়াড়কে কেবল মাঠের খেলার জন্য নয়, বরং টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল এবং ফিজিক্যালি আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলা হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ফুটবল কাঠামো এখনো মূলত ‘ক্যাম্প ভিত্তিক’। বাফুফে নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টের আগে স্বল্পমেয়াদী ক্যাম্প করে দল সাজায়, যা আধুনিক ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়। আরহাম যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তিনি হয়তো এখানকার আবহাওয়া বা কোচিং স্টাইলের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে মানিয়ে নিতে পারেননি, যা একজন কিশোরের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সিস্টেমে তিনি নিয়মিত লিগ খেলার সুযোগ পাচ্ছেন, পুষ্টিবিদ ও ফিটনেস ট্রেনারদের অধীনে নিজেকে শানিয়ে নিচ্ছেন। তার রাইট উইং থেকে রাইট ব্যাকে খেলার সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, তিনি আধুনিক ফুটবলের ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শনে অভ্যস্ত হচ্ছেন—যা বাংলাদেশের গতানুগতিক কোচিংয়ে সচরাচর দেখা যায় না।

প্রবাসী ফুটবলারদের জন্য অশনি সংকেত:
আরহাম ইসলামের ঘটনাটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (BFF) জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা বা ‘ওয়েক-আপ কল’। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা—যেমন ইংল্যান্ডের হামজা চৌধুরী বা জিদান মিয়া—বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ দেখালেও, বাফুফের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কোচদের রক্ষণশীল মানসিকতার কারণে অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় কোচরা অনেক সময় প্রবাসী ফুটবলারদের ফিটনেস বা খেলার ধরণ নিয়ে সন্দিহান থাকেন, অথবা তাদের ‘বিদেশি’ ট্যাগ দিয়ে দূরে ঠেলে দেন। ভিয়েতনাম সফরে আরহামকে বাদ দিয়ে স্থানীয় তারকাদের ওপর ভরসা করার ফলাফল আমরা দেখেছি। যদি এখনই একটি সুনির্দিষ্ট প্রবাসী স্কাউটিং পলিসি তৈরি না করা হয়, তবে আরহামের মতো আরও অনেক প্রতিভাবান তরুণ তাদের জন্মভূমি বা আবাসের দেশকেই (যেমন- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া) বেছে নেবে। তখন বাংলাদেশের হাতে কেবল আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। আরহামের অস্ট্রেলিয়া দলে ডাক পাওয়া প্রমাণ করে, আমাদের হীরে যাচাইয়ের জহুরিদের চশমার পাওয়ার বদলানোর সময় এসেছে।
ভবিষ্যৎ সমীকরণ: আরহাম কি এখনো বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারবেন?
ফুটবল প্রেমীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আরহাম কি চিরতরে বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে গেলেন?
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বয়সভিত্তিক দলে (যেমন অনূর্ধ্ব-১৭ বা অনূর্ধ্ব-২০) খেললেও একজন খেলোয়াড় ভবিষ্যতে অন্য দেশের সিনিয়র জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা রাখেন, যদি তার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকে।
- আশার আলো: আরহাম যদি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এই টুর্নামেন্ট খেলেন, তবুও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ তার থাকবে।
- বাস্তবতা: কিন্তু প্রশ্ন হলো, যিনি অস্ট্রেলিয়ার পাইপলাইনে ঢুকে গেছেন এবং স্পেন-জাপানের মতো দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন, তিনি কি আর বাংলাদেশের মতো র র্যাংকিংয়ের নিচের সারির দলে ফিরতে চাইবেন?
- বাফুফের ভূমিকা: বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (BFF) তাকে তাদের রাডারে রেখেছে কি না, নাকি হামজা চৌধুরীর মতো তিনিও কেবল আলোচনার বিষয় হয়েই থাকবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রবাসী ফুটবলার এবং বাফুফের উদাসীনতা
আরহামের এই ঘটনা বাফুফের স্কাউটিং এবং প্রবাসী ফুটবলারদের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে। তারিক কাজীর মতো সফল উদাহরণ থাকার পরও কেন আরহামের মতো প্রতিভাকে ধরে রাখা গেল না?
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা যখন নিজেদের প্রমাণ করছেন, তখন বাফুফে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আরহামের অস্ট্রেলিয়া দলে সুযোগ পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য যতটা গর্বের, ঠিক ততটাই লজ্জার—কারণ আমরা তাকে চিনতে পারিনি।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার
আরহাম ইসলাম এখন অস্ট্রেলিয়ার জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের জাত চেনাতে প্রস্তুত। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে যে মেধা ও পরিশ্রম থাকলে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব, তা সে যে দেশের জার্সিই হোক না কেন। বাংলাদেশের ফুটবলের নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষার বিষয়।
আমরা কি কেবল প্রতিভাদের দূরে ঠেলে দেব, নাকি তাদের আপন করে নিয়ে দেশের ফুটবলের মানচিত্র বদলাব? আরহামের জন্য শুভকামনা, তিনি যেন তার ক্যারিয়ারের শিখরে পৌঁছাতে পারেন। তবে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের হৃদয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস হয়তো থেকেই যাবে—”ইশ! ছেলেটা আমাদের হতে পারত।”
আরও বিস্তারিত আপডেট ও খবর জানতে ভিজিট করুন আমাদের নিউজ ওয়েবসাইট jitawins News








