সাংবাদিকদের ক্রিকেট উৎসব পেশাটা যতটা রোমাঞ্চকর, ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং। সারাবছর যারা মাঠের খবর গ্যালারি থেকে বা প্রেস বক্স থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাদের নিজেদের খেলার সুযোগ খুব একটা হয়ে ওঠে না। খাতা-কলম, ক্যামেরা আর ল্যাপটপের ব্যস্ততায় ডুবে থাকা এই মানুষগুলোর জন্য এক পশলা স্বস্তির বাতাস নিয়ে এলো রংপুর রাইডার্স-বিএসজেএ মিডিয়া কাপ ক্রিকেট ২০২৫।
বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসজেএ) প্রতিবারের মতো এবারও আয়োজন করেছে এই মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট। তবে এবারের আয়োজনটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে বিপিএলের অন্যতম সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘রংপুর রাইডার্স’-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। কর্মব্যস্ত দিনগুলোর মাঝে সাংবাদিকদের জন্য একটু শ্বাস নেওয়ার এবং ক্রিকেট উৎসবে মেতে ওঠার এই সুযোগটি সোমবার থেকে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাচ্ছে। এই আর্টিকেলে আমরা টুর্নামেন্টের খুঁটিনাটি, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং এর গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বিএসজেএ মিডিয়া কাপ: সাংবাদিকদের বার্ষিক উৎসব
ক্রীড়া সাংবাদিকরা সারাবছর অন্যের জয়-পরাজয়ের গল্প লেখেন, ছবি তোলেন এবং ভিডিও করেন। হাজারো খেলার ভিড়ে নিজেদের ফিটনেস বা বিনোদনের জন্য সময় বের করা তাদের জন্য দুষ্কর। এই অভাববোধ থেকেই বিএসজেএ (BSJA) নিয়মিত আয়োজন করে আসছে মিডিয়া কাপ ক্রিকেট। এটি এখন আর নিছক কোনো টুর্নামেন্ট নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
‘রংপুর রাইডার্স-বিএসজেএ মিডিয়া কাপ ক্রিকেট-২০২৫, পাওয়ার্ড বাই এইস ডেভেলপার্স’—এই দীর্ঘ নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল আয়োজন। পেশাদারিত্বের চাপ সামলে সাংবাদিকরা যখন ব্যাট-বল হাতে মাঠে নামেন, তখন প্রেস বক্সের গাম্ভীর্য ভুলে সেখানে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। একে অপরের প্রতিপক্ষ হলেও দিনশেষে এটি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করে।

টুর্নামেন্টের ফরম্যাট ও ভেন্যু: ভিন্নধর্মী আয়োজন
এবারের টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ এর ভেন্যু এবং খেলার ধরন। সাধারণত ক্রিকেট মাঠের ঘাসে খেলা হলেও, এই টুর্নামেন্টের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের অ্যাস্ট্রো টার্ফে। কৃত্রিম ঘাসের এই মাঠে বলের গতি এবং বাউন্স সাধারণ মাঠের চেয়ে ভিন্ন হয়, যা টুর্নামেন্টে বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করবে।
সিক্স-এ সাইড ক্রিকেট (Six-a-Side)
সময়ের স্বল্পতা এবং উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে রাখতে টুর্নামেন্টটি ‘সিক্স-এ সাইড’ পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ প্রতিটি দলে ৬ জন করে খেলোয়াড় মাঠে নামবেন। এই ফরম্যাটে খেলা খুব দ্রুত গড়ায় এবং প্রতিটি বলই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চার-ছক্কার ফুলঝুরি দেখার জন্য এই ফরম্যাটটি দর্শকদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।
সাংবাদিকদের ক্রিকেট উৎসব জমকালো জার্সি উন্মোচন ও গ্রুপিং পর্ব
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) ভবনের ডাচ-বাংলা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে টুর্নামেন্টের জমকালো জার্সি উন্মোচন ও ড্র অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের জৌলুস বাড়িয়ে দিয়েছিলেন জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার এবং বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান।
অনুষ্ঠানে ৩২টি অংশগ্রহণকারী দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে গ্রুপিং নির্ধারণ করা হয়। মোট ৩২টি দলকে ৪টি করে দল নিয়ে ৮টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। গ্রুপ পর্বের লড়াই শেষে নকআউট পর্বের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে টুর্নামেন্ট।
উপস্থিত অতিথিবৃন্দ: অনুষ্ঠানে শুধু ক্রিকেটাররাই নন, উপস্থিত ছিলেন আয়োজক ও স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা:
- তাসভির উল ইসলাম: হেড অব অপারেশন্স, রংপুর রাইডার্স।
- মো. মোখসেদুল কামাল: স্টার নিউজের প্রধান নির্বাহী ও বিসিবির মিডিয়া কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান।
- লেফটেনেন্ট কর্নেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার মো. আলি রেজা: জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন্স), একমি কনজিউমার প্রোডাক্টস লিমিটেড।
- বিএসজেএ নেতৃত্ব: সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং টুর্নামেন্ট কমিটির আহ্বায়ক রায়হান আল মুঘনি।
মাঠের লড়াই: উদ্বোধনী দিনের আকর্ষণ
সোমবার সকালেই উৎসবমুখর পরিবেশে পর্দা উঠবে এই টুর্নামেন্টের। উদ্বোধনী দিনেই মাঠে নামছে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজপোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কম। তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছে ডিভিসি নিউজ। দুই দলেরই রয়েছে শক্তিশালী মিডিয়া ক্রিকেট দল, তাই উদ্বোধনী ম্যাচেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
শুধু উদ্বোধনী ম্যাচ নয়, গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই টানটান উত্তেজনা বিরাজ করবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। প্রতিটি মিডিয়া হাউজ তাদের সেরা একাদশ সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি ব্যাট-বলের লড়াইয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মরিয়া সবাই।

তারকার চোখে মিডিয়া ক্রিকেট: নুরুল হাসান সোহানের ভাবনা
জাতীয় দলের উইকেটরক্ষক ব্যাটার এবং রংপুর রাইডার্সের আইকন নুরুল হাসান সোহান এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে তিনি সাংবাদিকদের সবসময় মাঠের বাইরে কাজ করতে দেখেন। এবার তাদের খেলার মাঠে দেখতে পেয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত।
সোহান তার বক্তব্যে বলেন, “আমার কাছে মনে হয়, এটা খুব ভালো একটা উদ্যোগ। যত খেলা হবে—আমার মনে হয়, খেলার ভেতরে থাকলে মন থেকেও খুশি লাগে। আমি আশা করি, এরকম উদ্যোগ আরও বেশি দেখতে পাব ইনশাআল্লাহ।”
সোহানের এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে, খেলাধুলা শুধুমাত্র পেশাদার অ্যাথলেটদের জন্য নয়, বরং মানসিক প্রশান্তির জন্য সবারই খেলার মাঠে আসা উচিত।
করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্ব
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে করপোরেট হাউজগুলোর এগিয়ে আসা নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাংবাদিকদের বিনোদনের জন্য এমন আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ‘রংপুর রাইডার্স’ এবং ‘এইস ডেভেলপার্স’-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা টুর্নামেন্টের জৌলুস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের এই সহায়তা শুধু আর্থিক অনুদানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং লজিস্টিক সাপোর্ট, জার্সি স্পন্সরশিপ এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে টুর্নামেন্টটিকে একটি পেশাদার রূপ দিয়েছে। যখন কোনো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি বা কোম্পানি মিডিয়া কাপের মতো ইভেন্টে বিনিয়োগ করে, তখন তা প্রমাণ করে যে তারা দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার গুরুত্ব এবং সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে কতটা সম্মান করে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই টুর্নামেন্ট আয়োজনে এই ধরনের পার্টনারশিপ অনুপ্রেরণা জোগাবে।
স্পন্সর ও আয়োজকদের কথা
যেকোনো বড় টুর্নামেন্ট সফল করতে স্পন্সরদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এবার বিএসজেএ-র পাশে দাঁড়িয়েছে রংপুর রাইডার্স এবং এইস ডেভেলপার্স।
রংপুর রাইডার্সের বার্তা: রংপুর রাইডার্সের হেড অব অপারেশন্স তাসভির উল ইসলাম বলেন, “টুর্নামেন্টের সঙ্গে থাকতে পেরে রংপুর রাইডার্স পরিবার গর্বিত। সাংবাদিকরা টুর্নামেন্টে খেলবেন। নিশ্চিতভাবেই আনন্দটা ছড়িয়ে যাবে। টুর্নামেন্টের সাফল্য কামনা করছি এবং অংশগ্রহণকারী সকল দলকে অভিনন্দন।”
বিএসজেএ-র কৃতজ্ঞতা: আয়োজক সংগঠন বিএসজেএ-র সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু স্পন্সরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিএসজেএ-র আয়োজনে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের জন্য সংবাদকর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। সেই অপেক্ষা শেষ হলো। আমাদের সকল স্পন্সর প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ। তারা আমাদের পাশে না থাকলে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিলে এই টুর্নামেন্ট সফল হতো না।”
ক্রিকেটার ও সাংবাদিকদের সম্পর্কের নতুন রসায়ন
সাধারণত দৃশ্যপটটা এমন হয় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন এবং ক্রিকেটাররা উত্তর দিচ্ছেন। কিন্তু এই টুর্নামেন্ট সেই প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বাতাবরণ তৈরি করেছে। যখন জাতীয় দলের একজন তারকা ক্রিকেটার কিংবা বিপিএলের কোনো অধিনায়ক সাংবাদিকদের খেলার উদ্বোধন করতে আসেন, তখন তা পেশাদারী সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা তৈরি করে। নুরুল হাসান সোহানের উপস্থিতি এবং সাংবাদিকদের খেলা নিয়ে তার উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে যে, মাঠের বাইরে একে অপরের প্রতিপক্ষ মনে হলেও, দিনশেষে সবাই ক্রিকেট পরিবারেরই অংশ। এই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটার এবং মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে জমে থাকা অদৃশ্য দূরত্ব কমিয়ে আনতে একটি বড় সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
অ্যাস্ট্রো টার্ফের চ্যালেঞ্জ ও রোমাঞ্চ
মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের অ্যাস্ট্রো টার্ফ বা কৃত্রিম ঘাসের মাঠে ক্রিকেট খেলাটা সাধারণ ঘাসের মাঠের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বেশ চ্যালেঞ্জিং। এখানে বল মাটিতে পড়ার পর সাধারণের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে স্কিড করে ব্যাটারের দিকে আসে, যা সামলানো একজন অপেশাদার ক্রিকেটারের জন্য বেশ কঠিন। এছাড়া ফিল্ডিংয়ের সময় বলের গতিবিধি বোঝা এবং ডাইভ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে এই চ্যালেঞ্জটাই টুর্নামেন্টে বাড়তি উত্তেজনার জন্ম দেয়। যেহেতু বাউন্ডারি ছোট এবং আউটফিল্ড অত্যন্ত দ্রুত, তাই ব্যাটাররা বড় শট খেলতে উৎসাহিত হন, আর দর্শকরা উপভোগ করেন চার-ছক্কার বৃষ্টি। সাংবাদিকদের জন্য এই ভিন্নধর্মী কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়াটাই হবে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার
রংপুর রাইডার্স-বিএসজেএ মিডিয়া কাপ ক্রিকেট ২০২৫ শুধুমাত্র একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ক্রীড়া সাংবাদিকদের একঘেয়ে রুটিন থেকে মুক্তির এক অনন্য প্রয়াস। ৩২টি দলের অংশগ্রহণে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম আগামী কয়েকদিন মুখরিত থাকবে চার-ছক্কার শব্দে আর সাংবাদিকদের উল্লাসে।
পেশাগত দায়িত্বের বাইরে এসে সহকর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলার এই সুযোগ সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। রংপুর রাইডার্স এবং বিএসজেএ-র এই যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সৌহার্দ্যের এক নতুন বার্তা পৌঁছে দেবে বলে আশা করা যায়। জাগোনিউজ২৪.কম সহ অংশগ্রহণকারী সকল দলের জন্য রইল শুভকামনা। মাঠের লড়াইয়ে কে জিতবে, সেটা সময়ই বলে দেবে, তবে বন্ধুত্বের জয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আরও বিস্তারিত আপডেট ও খবর জানতে ভিজিট করুন আমাদের নিউজ ওয়েবসাইট jitawins News








