বিশ্বকাপ ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ, যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর হিসেবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আমেরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডায় তার টিকেট নিশ্চিত করার লড়াই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। নভেম্বর ২০২৫-এর আন্তর্জাতিক উইন্ডো বা বিরতিটি ছিল দলগুলোর জন্য সত্যিকার অর্থেই ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই। এই অল্প কয়েক দিনে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে ইউরোপীয় জায়ান্টদের পতন, আফ্রিকান ফুটবলে নতুন শক্তির উত্থান এবং এশীয় ফুটবলে অবিশ্বাস্য সব নাটকীয়তা। চলুন, নভেম্বরের এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচগুলোর গভীরে গিয়ে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
বিশ্বকাপ ২০২৬ ইউরোপীয় অঞ্চলের (UEFA) বাছাইপর্ব:
ইউরোপের বাছাইপর্ব সব সময়ই কঠিন এবং অনিশ্চয়তায় ভরা হয়, আর এবারের নভেম্বর উইন্ডো তার ব্যতিক্রম ছিল না। গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের খেলাগুলোয় নির্ধারিত হয়েছে কারা সরাসরি বিমানের টিকেট পাচ্ছে, আর কাদের ভাগ্য ঝুলে থাকছে।
- ইতালির বিশ্বমঞ্চে ফেরার সংগ্রাম: চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি (Italy) আবারও ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে সরাসরি কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়েছে। গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে ড্র করার কারণে তারা পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায়। এর ফলে, কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারও তাদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে আগামী বছরের মার্চ মাসের কঠিন প্লে-অফে। ইতালিয়ান ভক্তদের জন্য এটি একটি বিশাল ধাক্কা, কারণ প্লে-অফে তাদের লড়তে হবে তুরস্ক বা ইউক্রেনের মতো বিপজ্জনক দলের বিপক্ষে। আজ্জুরিদের রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং ফিনিশিংয়ের অভাব নভেম্বরের এই ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- নরওয়ের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন: অন্যদিকে, ইউরোপের ফুটবল আকাশে নতুন ইতিহাস লিখেছে নরওয়ে। আর্লিং হালান্ড এবং মার্টিন ওডেগार्डের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করে নরওয়ে দীর্ঘ কয়েক দশকের খরা কাটিয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। নভেম্বরের শেষ ম্যাচে তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবল প্রতিপক্ষকে দাঁড়াতেই দেয়নি। হালান্ডের গোলবন্যা এবং ওডেগार्डের প্লে-মেকিং নরওয়েকে তাদের গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি বড় সুসংবাদ। এ ছাড়াও ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং স্পেনের মতো পরাশক্তিরা প্রত্যাশিতভাবেই তাদের গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রেখে দাপটের সঙ্গে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে।
আফ্রিকা (CAF) ও এশিয়া (AFC): প্লে-অফের রোমাঞ্চকর লড়াই
নভেম্বর মাসটি আফ্রিকা এবং এশিয়া অঞ্চলের জন্য ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই মহাদেশগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মহাদেশীয় প্লে-অফের নকআউট পর্ব।
- আফ্রিকার নাটকীয় পটপরিবর্তন (CAF): আফ্রিকান অঞ্চলের বাছাইপর্বের সবচেয়ে বড় চমক ছিল নাইজেরিয়ার পতন। ১৪ থেকে ১৬ নভেম্বর মরক্কোতে অনুষ্ঠিত মিনি-টুর্নামেন্টে কঙ্গো ডিআর (DR Congo) অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলেছে। প্লে-অফের ফাইনালে নাইজেরিয়ার মতো তারকাবহুল দলের বিপক্ষে তারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে। নির্ধারিত সময়ে খেলা ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে (৪-৩) জয়ী হয়ে কঙ্গো ডিআর জিতে নেয় ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফের টিকেট। ভিক্টর ওসিমেন এবং ভিক্টর বনিফেসের মতো তারকা থাকা সত্ত্বেও নাইজেরিয়ার এই বিদায় আফ্রিকান ফুটবলে বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
- এশিয়ার প্লে-অফ যুদ্ধ (AFC): এশিয়ান অঞ্চলের প্লে-অফেও উত্তেজনার কমতি ছিল না। ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)-এর মধ্যকার দুই লেগের লড়াই ছিল উপভোগ্য। প্রথম লেগে ড্র হলেও, নভেম্বরের দ্বিতীয় লেগে ইরাক নিজেদের মাঠে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ৩-২ এগ্রিগেট স্কোরে জয়লাভ করে। এই জয়ের ফলে ২০০৩ এশিয়ান কাপ জয়ী ইরাক আবারও বিশ্বমঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এখন তাদের সামনে বাধা কেবল একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল ম্যাচ।
বাংলাদেশ বনাম ভারত: ২২ বছরের অপেক্ষা এবং কিংস অ্যারেনায় ইতিহাস
নভেম্বরের আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় এবং আবেগের ম্যাচটি ছিল ভারতের বিপক্ষে। যদিও এটি টেকনিক্যালি ২০২৭ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের অংশ, তবুও বিশ্বকাপের আবহেই এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
- ম্যাচের বিস্তারিত বিশ্লেষণ: ১৮ নভেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশ দল ভারতের ওপর চড়াও হয়ে খেলতে থাকে। ম্যাচের ১২ মিনিটের মাথায় শেখ মোরসালিন যে দুর্দান্ত গোলটি করেন, তা ছিল বিশ্বমানের। এরপর পুরো ম্যাচে বাংলাদেশ রক্ষণভাগ ছিল ইস্পাত কঠিন। তপু বর্মন এবং মিতুল মারমাদের দৃঢ়তায় ভারতের সুনীল ছেত্রীরা বারবার আক্রমণ করেও গোল করতে ব্যর্থ হন।
- ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ১-০ গোলের এই জয়টি বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটি মাইলফলক। দীর্ঘ ২২ বছর পর ভারতের বিপক্ষে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয় পেল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এই জয় শুধুমাত্র ৩ পয়েন্ট নয়, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা এবং সাহসিকতা থাকলে র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষেও জয় সম্ভব। এই জয়টি বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
২০২৬ সালের মার্চ: প্লে-অফের ‘বাঁচা-মরার’ সমীকরণ (Intercontinental Play-offs)
নভেম্বরের সব নাটকীয়তা শেষে এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ২০২৬ সালের মার্চ মাসের দিকে। ফিফা ২০ নভেম্বর জুরিখে যে ড্র (Draw) অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে, তা প্লে-অফের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এই টুর্নামেন্ট থেকেই নির্ধারিত হবে বিশ্বকাপের শেষ ২টি টিকেট।
- ফরম্যাট এবং ফিক্সচার: ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফে মোট ৬টি দল অংশ নেবে, তবে ফিফা র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকায় ইরাক এবং কঙ্গো ডিআর সরাসরি ফাইনালে খেলার সুবিধা (Bye) পেয়েছে।
- পাথ ১ (Path 1): জ্যামাইকা বনাম নিউ ক্যালেডোনিয়া ম্যাচে যারা জিতবে, তারা ফাইনালে মুখোমুখি হবে শক্তিশালী কঙ্গো ডিআর-এর। আফ্রিকান শক্তির বিপক্ষে জ্যামাইকার গতি হবে দেখার মতো বিষয়।
- পাথ ২ (Path 2): দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়া লড়বে কনকাকাফ অঞ্চলের সুরিনামের বিপক্ষে। এই ম্যাচের জয়ী দল ফাইনালে লড়বে এশিয়ার প্রতিনিধি ইরাক-এর সাথে। লা পাজের উচ্চতায় খেলার অভিজ্ঞতা থাকা বলিভিয়া এই টুর্নামেন্টে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামবে।
দক্ষিণ আমেরিকা (CONMEBOL): বাছাইপর্বের চূড়ান্ত চিত্র
দক্ষিণ আমেরিকার দীর্ঘ ১৮ রাউন্ডের বাছাইপর্বের খেলা আগেই শেষ হয়েছে, কিন্তু নভেম্বরের আপডেটে চূড়ান্ত সমীকরণগুলো পরিষ্কার হয়েছে।
- আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের অবস্থান: বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পুরো বাছাইপর্ব জুড়েই তাদের দাপট বজায় রেখেছে এবং পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থানে থেকে শেষ করেছে। অন্যদিকে, ব্রাজিল তাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন বাছাইপর্ব পার করলেও শেষ পর্যন্ত ৫ম স্থানে থেকে সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে। নেইমার ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ইনজুরি সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সেলেসাওরা বড় মঞ্চে তাদের জায়গা পাকা করে নিয়েছে।
- প্লে-অফে বলিভিয়া: দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৭ম স্থান অধিকার করে বলিভিয়া এখন মার্চ মাসের প্লে-অফ টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য থাকবে সুরিনাম এবং ইরাককে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া।

৪৮ দলের বর্ধিত বিশ্বকাপ ফরম্যাট
নভেম্বরের এই বাছাইপর্ব অন্য যেকোনো বারের চেয়ে কেন বেশি তীব্র ছিল, তার মূল কারণ হলো ফিফার নতুন ‘৪৮ দলের বিশ্বকাপ’ ফরম্যাট। আগে ৩২টি দল সুযোগ পেত বলে অনেক দল নভেম্বরের আগেই হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু এবার এশিয়া (৮.৫টি স্লট) এবং আফ্রিকার (৯.৫টি স্লট) মতো অঞ্চলগুলোতে সুযোগ বাড়ার কারণে মাঝারি মানের দলগুলোও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, এশিয়ার উজবেকিস্তান বা জর্ডানের মতো দলগুলো নভেম্বরের ম্যাচেও এমনভাবে লড়াই করেছে যেন এটিই তাদের শেষ সুযোগ। ৪৮ দলের এই ফরম্যাট নভেম্বরের প্রতিটি ম্যাচকে ‘ডেড রাবার’ (গুরুত্বহীন ম্যাচ) হতে দেয়নি, বরং শেষ মিনিট পর্যন্ত প্রতিটি পয়েন্টের জন্য দলগুলোকে ক্ষুধার্ত রেখেছিল। এর ফলে দর্শকেরাও এমন কিছু দলের খেলা দেখার সুযোগ পেয়েছে, যারা আগে কখনোই এই পর্যায়ে এত সিরিয়াস ফুটবল খেলেনি।
স্বাগতিক তিন দেশের (USA, কানাডা, মেক্সিকো) নভেম্বরের ব্যস্ততা
সারা বিশ্ব যখন বাছাইপর্বের চিন্তায় মগ্ন, তখন ২০২৬ বিশ্বকাপের তিন স্বাগতিক দেশ—আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকো—বসে ছিল না। যেহেতু তারা সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে, তাই তাদের কোনো বাছাইপর্ব খেলতে হয়নি। তবে নভেম্বরের উইন্ডোটি তারা কাজে লাগিয়েছে ‘কনকাকাফ নেশনস লিগ’-এর কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে। এই ম্যাচগুলো তাদের জন্য ছিল বিশ্বকাপের মহড়া বা ‘ড্রেস রিহার্সাল’। বিশেষ করে মেক্সিকো এবং আমেরিকার মধ্যকার পরোক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কানাডার ক্রমাগত উন্নতি নভেম্বরের আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। স্বাগতিক হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে তারা শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে হাই-ইনটেনসিটি ম্যাচ খেলেছে, যা তাদের দলের সমন্বয় এবং দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছে।
ইনজুরি শঙ্কা এবং সাসপেনশন: মার্চের আগে কোচদের কপালে ভাঁজ
নভেম্বরের ম্যাচগুলো শেষ হওয়ার পর অনেক দলের কোচদের এখন নতুন দুশ্চিন্তার নাম ‘ইনজুরি’ এবং ‘সাসপেনশন’। ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু তারকা ফুটবলার নভেম্বরের এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচগুলোতে গুরুতর চোট পেয়েছেন, যা তাদের ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি আগামী মার্চের প্লে-অফ খেলাকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এছাড়া, নভেম্বরের বাঁচা-মরার লড়াইয়ে প্রচুর হলুদ ও লাল কার্ড দেখার কারণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় মার্চের সেমিফাইনাল বা ফাইনালে নিষিদ্ধ থাকবেন। প্লে-অফের মতো ‘নকআউট’ ম্যাচে দলের মূল তারকার অনুপস্থিতি বা কার্ডের কারণে সাসপেনশন পুরো দলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে। তাই এখন কোচদের পরবর্তী তিন মাস কাটাতে হবে বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি এবং ইনজুরি ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনায়।
JitaBet , JitaWin , এবং JitaGo- তে আপনার বাজি ধরুন, তারা সত্যিই ভালো সম্ভাবনা অফার করে, খেলুন এবং বড় জয়লাভ করুন!
উপসংহার
নভেম্বর মাসটি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ছিল এক রোলার-কোস্টার রাইড। ইতালির কান্না, নরওয়ের হাসি, কঙ্গোর গর্জন আর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়—সব মিলিয়ে এই উইন্ডোটি ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন অপেক্ষা মার্চ ২০২৬-এর, যেখানে শেষ হবে দীর্ঘ এই বাছাইপর্বের যাত্রা এবং আমরা পাবো ৪৮টি দলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা।
আরও বিস্তারিত আপডেট ও খবর জানতে ভিজিট করুন আমাদের নিউজ ওয়েবসাইট jitawins News








